সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ |  saintmartinbdnews@gmail.com

প্রচ্ছদ » পর্যটন » "মেঘের দেশ সাজেক " ভ্রমণের স্মৃতিকথা

"মেঘের দেশ সাজেক " ভ্রমণের স্মৃতিকথা

আপডেট : ০৮ অক্টোবর, ২০১৯ , সময়ঃ ১১:৪৮ অপরাহ্ন

সাজেক

তরিকুল ইসলাম, ইবিঃ
মেঘের দেশ সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নের একটি প্রধান পর্যটন কেন্দ্র৷এটি রাঙ্গামাটি জেলার সর্বউত্তরের আর ভারতের দক্ষিণ পশ্চিমের সীমান্ত ঘেষে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর একটি উঁচু উপত্যকা ৷যার ভিতর দিয়ে লুসাই নদী প্রবাহিত৷ সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য আর পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য৷ বর্তমানে পর্যটকদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই সাজেক ভ্যালি ৷
মেঘের দেশ সাজেকে গিয়েছিলাম চার বছর আগে৷ সময়টি ছিল ২০১৫ইং সালের অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ ৷                                                           কুরবানীর ঈদের সপ্তাহ খানেক পর, ট্যুর এ যাওয়া হবে পাহাড়ী দেশে৷ সুযোগ হাতছাড়া করলাম না৷  তখন পড়তাম  ঢাকার সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ৷  থাকতাম ফার্মগেটের পূর্ব রাজা বাজার একটি মেসে৷         
   আমাদের ট্যুরটি ছিল রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায়৷   আমরা ছিলাম প্রায় আশিজন৷  ঢাবি, বুয়েট আর সরকারী বিজ্ঞান কলেজের ছাত্র ছিলাম সবাই ৷  অক্টোবরের এক তারিখ রাত দশটায় শ্যামলী পরিবহনের দুটি বাসে করে রওয়ানা হলাম৷ পরেরদিন সকালে ৭টার দিকে আমরা পৌঁছাই খাগড়াছড়ি শহরে৷ সকালের নাস্তা সেরে উঠলাম চাঁদের গাড়িতে (কেউবা বলে চান্দের গাড়ি) ৷ প্রথমদিনের লক্ষ্য ছিল বিকালের মধ্যে সাজেক পৌঁছানো ৷      
  মেঘের দেশ সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও রাঙ্গামাটি শহর থেকে দুরত্ব প্রায় ১৩০কিমি আর খাগড়াছড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিমি ৷ তাই সাজেক যেতে হলে খাগড়াছড়ি শহর থেকে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক ৷ যাইহোক, এই ৭০কিমি এর মধ্যবর্তী স্থান বাঘাইছড়ি ৷ শহর থেকে ৩৫কিমি , আর বাঘাইছড়ি থেকে সাজেক ৩৫কিমি (সেনাবাহিনীর অধীনে নির্মিত)৷ বাস বা পরিবহণে করে  দীঘিনালা পর্যন্ত সরাসরি যাওয়া যায় এবং দীঘিনালা থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৪৯ কিলোমিটার । আর রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায় । সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে৷  খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে স্থানীয় গাড়িতে ( জিপ গাড়ি , সি.এন.জি , মটরসাইকেল ) করে সাজেকে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যম । এক্ষেত্রে পথে পড়বে বাঘাইহাট পুলিশ ও আর্মি ক্যাম্প। সেখান থেকে ভ্রমণরত সদস্যদের তথ্য দিয়ে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে । একে আর্মি এসকর্ট বলা হয় । আর্মিগণের পক্ষ থেকে গাড়িবহর দ্বারা পর্যটকদের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তার সাথে সাজেক পৌঁছে দেয়া হয় । দিনের দুইটি নির্দিষ্ট সময় (সকাল ১০:৩০ এবং বিকাল ৩:৩০) ব্যতীত আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ হতে সাজেক যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না । পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় । সাজেকগামী জিপ গাড়িগুলো স্থানীয়ভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত । সাজেক যাওয়ার পথে বাঘাইহাটে হাজাছড়া ঝর্ণা অবস্থিত । অনেক পর্যটকগণ মূল রাস্তা হতে সামান্য ট্রেকিং করে গিয়ে ঝর্ণাটির সৌন্দর্য উপভোগ করে থাকেন ৷
সাজেকগামী  উঁচুনিচু পাহাড়ের বুক চিড়ে  এই আঁকাবাঁকা রাস্তাগুলি ঠাঁই করে নিয়েছে৷ পথে পড়বে তিনটি ঝর্ণা আর আলুটিলার গুহা ৷  আমরা হাজাছড়া ঝর্ণা, রিসাং ঝর্ণা ও দ্বৈতছড়া ঝর্ণাগুলিতে গেলাম৷ দ্বৈতছড়া ঝর্ণার পথটা অনেক সরু আর পথে একটি বিশাল বটবৃক্ষ পড়বে৷এসবগূলি দেখতে দেখতে এগোতে  থাকলাম   সাজেক ভ্যালীর দিকে ৷ আমরা সাজেক পৌঁছাই দুই অক্টোবর বিকাল চারটায়৷  দুপুরের খাবারের কথা না বললেই নয় , উপজাতিদের রেস্তোরা ৷ ছিল ভাতের সাথে মুরগীর মাংস, ডিম ভাজা , ডাউল আর বাশঁ ভাজি(কচি বাশেঁর কোড়ল) ৷ খাবারের মূল্য ১০০—২০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে৷                                                        
 রাতে থাকলাম কাঠনির্মিত ঘরে৷ বর্তমানে অনেক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে৷ আছে সৌন্দর্যমন্ডিত  কটেজ৷ উল্লেখযোগ্য রিসোর্টগুলির মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইজ সাজেক, মেঘপুন্ঞ্জি রিসোর্ট, রয়েল রিসোর্ট, মেঘ বালিকা রিসোর্ট, মেঘ কাব্য রিসোর্ট, শিন্ঞ্জন রিসোর্ট, সিনারী হোটেল প্রভৃতি৷ আর সেনাবাহিনী পরিচালিত একমাত্র রিসোর্ট রুণময় রিসোর্ট, এখানে থাকতে হলে প্রথম শ্রেণির সরকারি অফিসার কর্তৃক রিকমান্ডেড হয়ে আসতে হয়৷ভাড়া পড়বে রুমপ্রতি  ৫০০০ — ৭০০০ টাকা, যেখানে প্রতি রুমে ৪জন থাকা যায় ৷ আর সিঙ্গেল রুমে দুই জন করে থাকা যায়,  ভাড়া পড়বে ৩০০০— ৪০০০টাকা ৷ তবে অফ সিজনে ৩০% ছাড় পাওয়া যায়৷সাজেকে প্রধানত লুসাই, পাংখোয়া, ত্রিপুরা আদিবাসীরা বসবাস করে৷এখানকার  কলা ও কমলা বিখ্যাত, পাহাড়ে ভ্রমণে এগুলো অত্যাবশ্যকীয় খাবার হিসেবে সুপরিচিত৷সাজেকের আবাসিক রোডের পাশে একটি গির্জা রয়েছে, অধিকাংশ খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারী হওয়ায় এখানে নানাবিধ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করা হয়৷বিদ্যুতের সুব্যবস্থা না থাকায় সোলার পদ্ধতিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয় ৷ পানির উৎস হিসেবে ঝর্ণাই প্রধান, ঝর্ণা থেকে পানি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়া হয়৷ আর যোগাযোগের জন্য রবি ও টেলিটক মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়, অন্য কোন অপারেটর এখানে নেটওয়ার্ক পায় না৷
 পরের দিন সকালে আমি একটূ তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠেছিলাম৷ একাকী হাটতে লাগলাম সাজেক আর্মি ক্যাম্পের দিকে৷ মসজিদে ঢুকলাম ফজর  নামাজের আযানের সাথে সাথে৷ এটি রাঙ্গামাটির সর্ব উত্তরের সর্বশেষ আর্মি ক্যাম্প ও মসজিদ ৷ মসজিদে উপস্থিত ছিলেন ইমাম ,  ক্যাম্প কমান্ডার_ মেজর(মুয়াজ্জিন)৷ অনেক বিষয়ে উনাদের সাথে আলাপ হলো৷ জানালেন পাহাড়ের অনেক ইতিহাস  আর পাহাড়ী মানুষদের জীবনযাত্রা  সম্পর্কে৷ আমার কাছে ছিল লাল রঙের  গামছা , গলায় ঝুলিয়ে রাখা যেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দীকি বীর উত্তম সাহেবের পার্টির লোক ৷ মেজর সাহেব একখানা টূপি আমার মাথায় পড়িয়ে গামছা দিয়ে পাগড়ী বাধার মত বেধে দিলেন৷ অবশ্য এতক্ষনে অনেক সৈন্য মসজিদে প্রবেশ করেছেন, অতপর জামাতের সহিত নামাজ শেষ করে আবার আলাপ হলো ইমাম আর ক্যাম্পের এক সেনা সদস্যের সাথে৷


সর্বশেষ সংবাদ

বিজ্ঞাপন